বিশ্লেষণী প্রবন্ধ
মিরাজে জান্নাত ও জাহান্নাম দর্শন: কুরআন ও হাদিসের সাংঘর্ষিক বর্ণনা
কুরআনে বিচার আগে, শাস্তি পরে—এই কাঠামোর সঙ্গে মিরাজে নবির দেখা শাস্তি ও পুরস্কারের দৃশ্য কীভাবে মেলে? কয়েকটি যৌক্তিক প্রশ্নের অনুসন্ধান।
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মিরাজ। কুরআনে এই রাত-ভ্রমণের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে—আল্লাহ তাঁর বান্দাকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন (কুরআন, সূরা আল-ইসরা ১৭:১)। হাদিসের একাধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী, এই ভ্রমণেই নবি মুহাম্মদ জান্নাতের কিছু দৃশ্য এবং জাহান্নামে নির্দিষ্ট পাপীদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করেন।
এসব বর্ণনা এসেছে আনাস ইবন মালিক বর্ণিত হাদিসে (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ১৩৩৪০), ইবন আব্বাস বর্ণিত হাদিসে (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪) এবং সহিহ বুখারিতে (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। এই বর্ণনাগুলো কুরআনের বিচার-ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
মিরাজে দেখা জাহান্নামের শাস্তি
একাধিক বর্ণনায় নবি মিরাজের সময় জাহান্নামে কিছু পাপীর শাস্তি দেখেন:
- ঊর্ধ্বগমনের সময় তিনি এমন কিছু মানুষকে দেখেন যাদের নখ ছিল তামার, এবং তা দিয়ে তারা নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। জিবরিল জানান, এরা সেইসব মানুষ যারা পরনিন্দা করত এবং অন্যের সম্মানহানি করত (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ১৩৩৪০)।
- ইবন আব্বাস বর্ণিত একটি বিস্তারিত বর্ণনায় নবি জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখেন, কিছু মানুষ মৃতদেহ বা মানুষের মাংস খাচ্ছে। ব্যাখ্যা: এরাও পরনিন্দাকারী (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪)।
- একই বর্ণনায় তিনি লাল-নীল বর্ণের, খর্বকায় ও এলোমেলো চেহারার এক ব্যক্তিকে শাস্তিপ্রাপ্ত দেখেন। জিবরিল জানান, এ-ই সেই ব্যক্তি যে (নবি সালিহের জাতির) উটনিকে হত্যা করেছিল (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪)।
মিরাজে দেখা জান্নাত
একই ভ্রমণে নবি জান্নাতের দৃশ্যও দেখেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় তিনি সাত আসমানে একে একে পূর্ববর্তী নবিদের—মুসা, ঈসা, ইবরাহিম প্রমুখ—সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাঁরা সেখানে জীবিত ও কথোপকথনরত অবস্থায় ছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করার পর তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন এবং সেখানে মুক্তার তাঁবু ও কস্তুরির মাটির বর্ণনা দেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। এই ভ্রমণেই উম্মতের ওপর নামাজ ফরজ হয়—প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত, পরে তা কমে দাঁড়ায় পাঁচে (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)।
অর্থাৎ মিরাজের বর্ণনায় জাহান্নামে চলমান শাস্তি ও জান্নাতের অধিষ্ঠিত অবস্থা—দুটোই উপস্থিত।
কুরআনের কাঠামো: বিচার আগে, শাস্তি পরে
কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষের চূড়ান্ত বিচার অনুষ্ঠিত হবে কিয়ামতের দিনে। সূরা আল-আম্বিয়ায় বলা হয়েছে যে কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে (কুরআন, সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭)। অন্যত্র বলা হয়েছে, কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সেও তা দেখবে (কুরআন, সূরা আয-যিলযাল ৯৯:৭–৮)।
আরও স্পষ্টভাবে কুরআন বলছে, প্রতিদান পুরোপুরি দেওয়া হবে কেবল কিয়ামতের দিনেই—প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, আর কিয়ামতের দিনই কর্মফল পূর্ণরূপে দেওয়া হবে (কুরআন, সূরা আলে-ইমরান ৩:১৮৫)। এমনকি জান্নাত-জাহান্নামে প্রবেশের দৃশ্যও আসে বিচারের পরে—বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর অবিশ্বাসীদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে এবং মুত্তাকিদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, আর পৌঁছানোর পরই কেবল দরজা খুলে দেওয়া হয় (কুরআন, সূরা আয-যুমার ৩৯:৭১–৭৩)।
এই আয়াতগুলোর ভিত্তিতে ইসলামি বিশ্বাসের একটি সাধারণ কাঠামো দাঁড়ায়:
- পার্থিব জীবন
- মৃত্যু
- কিয়ামত
- বিচার
- জান্নাত বা জাহান্নাম
অর্থাৎ বিচার সম্পন্ন হওয়ার পরই চূড়ান্ত পুরস্কার বা শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা।
প্রথম প্রশ্ন: বিচার ছাড়া শাস্তি কীভাবে?
এখানেই প্রথম মৌলিক প্রশ্নটি আসে।
কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী চূড়ান্ত বিচার যদি কিয়ামতের দিনে অনুষ্ঠিত হয় (কুরআন, সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭), তাহলে মিরাজে দেখা এসব শাস্তি শুরু হলো কখন?
মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল নবির জীবদ্দশায়—পৃথিবীর ইতিহাস শেষ হওয়ার বহু আগে। কিয়ামত তখনো সংঘটিত হয়নি, আজও হয়নি। তবু বর্ণনায় দেখা যায়, কিছু মানুষ তখনই সক্রিয়ভাবে জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করছে (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪)। তাহলে চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই তারা কীভাবে শাস্তির অধীন হলো?
যদি বলা হয় এগুলো কিয়ামত-পূর্ব শাস্তি, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কুরআনে বিচার দিবসকে যে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার অবস্থান তখন কোথায়? বিচার যদি কেবল একটি পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ধাপ হয়, তাহলে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কারা?
আগের আলোচনায় প্রশ্ন ছিল, শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অতীতের, ভবিষ্যতের, নাকি প্রতীকী মানুষ? ইবন আব্বাস বর্ণিত হাদিসটি এই প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করে।
কারণ সেখানে অন্তত একজনকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে—যে ব্যক্তি নবি সালিহের জাতির উটনিকে হত্যা করেছিল (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪)। এই ব্যক্তি ছিলেন সামুদ জাতির একজন, অর্থাৎ নবি মুহাম্মদের জন্মেরও বহু শতাব্দী আগের একজন মৃত মানুষ। অথচ মিরাজের সময় তাঁকে শাস্তিপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখানো হয়।
এতে প্রশ্নটি দাঁড়ায়: যদি অতীতের একজন সুনির্দিষ্ট পাপীকে চূড়ান্ত বিচারের আগেই সক্রিয় শাস্তিতে দেখা যায়, তাহলে কিয়ামতের চূড়ান্ত বিচার আসলে নতুন কী যোগ করে? শাস্তি যদি আগেই শুরু হয়ে থাকে, তবে বিচার-দিবসের স্বতন্ত্র ভূমিকা কী?
ভবিষ্যতের মানুষ ও স্বাধীন ইচ্ছা
অন্যদিকে, পরনিন্দাকারীদের মতো শ্রেণিগুলো (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮) কেবল অতীতের মানুষেই সীমাবদ্ধ নয়; এমন পাপ সব যুগেই ঘটে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। তাহলে যেসব মানুষ তখনো জন্মায়নি, তাদের অপরাধও সংঘটিত হয়নি—তাদের শাস্তি কীভাবে পূর্বনির্ধারিত অবস্থায় দেখানো সম্ভব?
এখানে স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) ও পূর্বনির্ধারণ (Predestination)-সংক্রান্ত একটি দার্শনিক সমস্যা তৈরি হয়। ভবিষ্যতের কাজ যদি আগে থেকেই নিশ্চিত ও অপরিবর্তনীয় হয়, তাহলে মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র আসলে কতটুকু বাস্তব?
বরযখের ব্যাখ্যা ও তার সমস্যা
অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম এই আপাত অসঙ্গতির ব্যাখ্যায় বলেন, এগুলো জাহান্নামের চূড়ান্ত শাস্তি নয়, বরং বরযখের শাস্তি। কুরআনে বলা হয়েছে, মৃতদের পেছনে বরযখ থাকবে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত (কুরআন, সূরা আল-মুʼমিনুন ২৩:১০০)। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী অবস্থায় কিছু মানুষ শাস্তি ভোগ করে।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। সাধারণভাবে বরযখকে কবরের মধ্যবর্তী অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অথচ ইবন আব্বাস বর্ণিত বর্ণনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, নবি “জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে” এসব শাস্তি দেখেন (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪)। অর্থাৎ পাঠ্যটি দৃশ্যগুলোকে জাহান্নামে স্থাপন করছে, কবরের মধ্যবর্তী অবস্থায় নয়। তাহলে এগুলো বরযখের অভিজ্ঞতা, নাকি জাহান্নামের প্রাথমিক রূপ? হাদিসের ভাষা এই সীমারেখা সবসময় পরিষ্কার করে না।
পুরস্কারও কি বিচারের আগেই?
মিরাজ আমাদের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। শুধু শাস্তি নয়, পুরস্কারের চিত্রও সেখানে বিচারের আগেই উপস্থিত।
প্রকৃত মিরাজে নবি সাত আসমানে পূর্ববর্তী নবিদের জীবিত, সক্রিয় ও কথোপকথনরত অবস্থায় দেখেন, এবং নিজে জান্নাতে প্রবেশ করেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। কিন্তু মিরাজের সময়েও কিয়ামত হয়নি, চূড়ান্ত বিচারও সম্পন্ন হয়নি।
তাহলে এই নবিরা বিচারের আগেই কীভাবে নিজ নিজ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত? অর্থাৎ মিরাজে আমরা একদিকে দেখি বিচারের আগে শাস্তির চিত্র (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮), অন্যদিকে বিচারের আগে পুরস্কৃত ও স্থানপ্রাপ্ত অবস্থার চিত্র (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। পরকালের উভয় দিক—শাস্তি ও পুরস্কার—কুরআনের কেন্দ্রীয় বিচার-দিবসের আগেই কার্যকর বলে মনে হয়। যদি তা-ই হয়, তবে কিয়ামতের চূড়ান্ত বিচারের স্বতন্ত্র ভূমিকা ও অপরিহার্যতা ঠিক কোথায়?
আরেকটি প্রশ্ন: সর্বজ্ঞতা ও নামাজ কমানোর দরকষাকষি
মিরাজের নামাজ-প্রসঙ্গটিও একটি আলাদা দার্শনিক প্রশ্ন তোলে।
বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন, এবং মুসার বারবার পরামর্শে নবির অনুরোধের মুখে তা কমিয়ে শেষ পর্যন্ত পাঁচে নামিয়ে আনা হয়। আল্লাহ বলেন, এগুলো পাঁচ ওয়াক্ত, তবে প্রতিদানে পঞ্চাশের সমান—কারণ তাঁর বাণী পরিবর্তন হয় না (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। এখান থেকে কয়েকটি প্রশ্ন আসে।
প্রথমত, সর্বজ্ঞ আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানতেন উম্মত পঞ্চাশ ওয়াক্ত বহন করতে পারবে না, তাহলে প্রথমে পঞ্চাশ ফরজ করে পরে ধাপে ধাপে কমানোর প্রয়োজন হলো কেন?
দ্বিতীয়ত, বিধান কার্যত একাধিকবার পরিবর্তিত হলো (পঞ্চাশ থেকে নেমে পাঁচ), অথচ একই বর্ণনায় আল্লাহ বলেন তাঁর বাণী অপরিবর্তনীয় (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯)। লক্ষণীয়, হাদিসের এই বাক্যটি প্রায় হুবহু কুরআনের একটি আয়াতের প্রতিধ্বনি—“আমার কাছে কথা পরিবর্তিত হয় না” (কুরআন, সূরা ক্বাফ ৫০:২৯)। অর্থাৎ ঠিক যে মুহূর্তে নামাজের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে পাঁচে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেই মুহূর্তেই আল্লাহ নিজের বাণীর অপরিবর্তনীয়তার নীতিটি উচ্চারণ করছেন। সংখ্যা পরিবর্তিত হওয়া এবং “বাণী পরিবর্তন হয় না”—এই দুইয়ের মধ্যে একটি আপাত অসঙ্গতি থেকে যায়।
তৃতীয়ত, এখানে একজন মানব-নবি (মুসা) উম্মতের সক্ষমতা সম্পর্কে আল্লাহর প্রাথমিক নির্দেশের চেয়ে বেশি বাস্তববোধ দেখান বলে চিত্রিত হয়েছেন। সর্বজ্ঞ সত্তার একটি নির্দেশ একজন নবির পরামর্শে বারবার সংশোধিত হওয়ার এই বর্ণনা ঐশী জ্ঞানের পূর্ণতা ও অপরিবর্তনীয়তার ধারণার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
প্রচলিত আপত্তি ও সংক্ষিপ্ত জবাব
এই আলোচনার বিপরীতে সাধারণত কয়েকটি আপত্তি তোলা হয়। দুটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি ও তার পর্যালোচনা নিচে দেওয়া হলো।
আপত্তি ১: কুরআনেই তো বিচারের আগে শাস্তির উল্লেখ আছে। ফিরআউনের অনুসারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাদের সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়, আর কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তিতে প্রবেশ করানো হবে (কুরআন, সূরা গাফির ৪০:৪৬)। অর্থাৎ বিচারের আগেও এক ধরনের শাস্তি কুরআনস্বীকৃত।
পর্যালোচনা: এই আয়াতটি আপত্তি নিরসনের বদলে বরং মূল প্রশ্নটিকেই আরও তীক্ষ্ণ করে। কারণ কুরআন একদিকে বলছে চূড়ান্ত প্রতিদান কেবল কিয়ামতের দিনে (কুরআন, সূরা আলে-ইমরান ৩:১৮৫), আবার অন্যদিকে বিচারের আগেই শাস্তির চিত্র দিচ্ছে (কুরআন, সূরা গাফির ৪০:৪৬)। শাস্তি যদি আগেই কার্যকর হয়, তবে কিয়ামতের ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা (কুরআন, সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭) নতুন কী যোগ করে—এই প্রশ্নটিই থেকে যায়।
আপত্তি ২: শহিদরা তো বিচারের আগেই জীবিত ও প্রতিদানপ্রাপ্ত। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত মনে কোরো না; বরং তারা জীবিত, তাদের প্রতিপালকের কাছে রিযিকপ্রাপ্ত (কুরআন, সূরা আলে-ইমরান ৩:১৬৯)। অতএব বিচারের আগেও কারও কারও প্রতিদান শুরু হতে পারে।
পর্যালোচনা: এটি একটি সংগত পাল্টা-যুক্তি, এবং মিরাজে নবিদের আসমানে অধিষ্ঠিত দেখার বিষয়টির সঙ্গে এর মিল আছে। তবে এখানেও সেই একই আয়াত বাধা হয়ে দাঁড়ায়—কুরআন বলছে পূর্ণ প্রতিদান সংরক্ষিত কিয়ামতের জন্য (কুরআন, সূরা আলে-ইমরান ৩:১৮৫)। তাছাড়া মিরাজে দেখা দৃশ্যগুলো—জাহান্নামে সক্রিয় শারীরিক শাস্তি, আগুন, খুলে দেওয়া দরজা—বরযখের সাধারণ ধারণার চেয়ে চূড়ান্ত জান্নাত-জাহান্নামের চিত্রের কাছাকাছি। ফলে সীমারেখা অস্পষ্টই থেকে যায়।
উপসংহার
এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং কয়েকটি যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করা।
কুরআনে বর্ণিত বিচার-পরবর্তী শাস্তির ধারণা এবং মিরাজে বর্ণিত শাস্তি ও পুরস্কারের দৃশ্যের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব এ বিষয়ে নানা ব্যাখ্যা দিয়েছে, তবে সেই ব্যাখ্যাগুলোও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়:
- বিচার শুরু হওয়ার আগেই জাহান্নামে শাস্তি কীভাবে কার্যকর হয় (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪)?
- অতীতের একজন সুনির্দিষ্ট পাপীকে যদি বিচারের আগেই শাস্তিতে দেখা যায় (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪), তবে চূড়ান্ত বিচার নতুন কী যোগ করে?
- শ্রেণিগত পাপীরা যদি ভবিষ্যতের অজাত মানুষও হয়, তবে স্বাধীন ইচ্ছার স্থান কোথায়?
- শাস্তি যদি জাহান্নামে দেখানো হয়, তবে তা বরযখের ব্যাখ্যার সঙ্গে কীভাবে মেলে?
- মিরাজে নবিরা যদি বিচারের আগেই জান্নাতে অধিষ্ঠিত (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯), তবে পুরস্কারও কি বিচারের আগেই শুরু হয়ে গেছে?
- পঞ্চাশ থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামাজ কমানোর দরকষাকষি (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯) সর্বজ্ঞতা ও অপরিবর্তনীয়তার ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
ধর্মীয় বর্ণনাকে যখন সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে দেখা হয়, তখন এমন অনেক প্রশ্ন সামনে আসে যেগুলোর উত্তর নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। আর সেই প্রশ্নগুলোই চিন্তা, অনুসন্ধান ও আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে।
সূত্র
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮ — আনাস ইবন মালিক বর্ণিত; ঊর্ধ্বগমনের সময় তামার নখে মুখ-বুক আঁচড়ানো পরনিন্দাকারীদের শাস্তি (হাসান/সহিহ)
- মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ১৩৩৪০ — আনাস ইবন মালিক বর্ণিত; উপরের হাদিসেরই সমান্তরাল বর্ণনা
- মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২৩২৪ — ইবন আব্বাস বর্ণিত; জাহান্নামে পরনিন্দাকারী ও উটনি-হত্যাকারীর শাস্তি, ইবরাহিমের সাক্ষাৎ (মান নিয়ে মতভেদ: ইবন কাসির/শাকির/সুয়ুতি—সহিহ; আরনাউত—দুর্বল)
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯ — কিতাবুস সালাত; মিরাজে নবিদের সাক্ষাৎ, জান্নাতে প্রবেশ, এবং পঞ্চাশ থেকে পাঁচে নামাজ কমানো
- কুরআন — সূরা আল-ইসরা ১৭:১; সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭; সূরা আয-যিলযাল ৯৯:৭–৮; সূরা আলে-ইমরান ৩:১৮৫ ও ৩:১৬৯; সূরা আয-যুমার ৩৯:৭১–৭৩; সূরা আল-মুʼমিনুন ২৩:১০০; সূরা ক্বাফ ৫০:২৯; সূরা গাফির ৪০:৪৬

Leave a Reply